রাজবাড়ীতে এক নারীকে কয়েকজন যুবকের মারধর ও লাথি দেওয়ার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওটি শেয়ার করে দাবি করা হচ্ছে, ওই নারী একজন ম্যাজিস্ট্রেট। আবার কেউ কেউ বলছেন, ভোক্তা অধিকার সংক্রান্ত অভিযোগ করায় তার ওপর হামলা হয়েছে।
তবে যাচাই করে দেখা গেছে, ভাইরাল ভিডিওর ওই নারী কোনো ম্যাজিস্ট্রেট বা ভোক্তা অধিকারবিষয়ক কর্মকর্তা নন। তিনি রাজবাড়ী শহরের বড় বাজারের একজন কাপড় ব্যবসায়ী। ব্যবসায়িক বিরোধের জেরে বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে উত্তেজনার মধ্যে তাকে ধাওয়া ও মারধরের ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
ঘটনাটি ঘটেছে শনিবার (২৯ আগস্ট) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে রাজবাড়ী শহরের পান্না চত্বরে। পরে এর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
ভাইরাল ভিডিওতে দেখা যায়, কয়েকজন যুবক এক নারীকে ঘিরে ধরে হামলা ও মারধর করছেন। একপর্যায়ে একজন যুবক ওই নারীকে লাথি দেন। ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের দাবি করা হয়। কেউ দাবি করেন, ওই নারী একজন ম্যাজিস্ট্রেট। আবার কেউ বলেন, ভোক্তা অধিকার দপ্তরে অভিযোগ দেওয়ায় তাকে মারধর করা হয়েছে।
তবে রাজবাড়ী সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) উত্তম কুমার ঘোষ জানিয়েছেন, এসব দাবি সঠিক নয়।
তিনি দ্য ঢাকা ডায়েরিকে বলেন, রেজান হোসাইন নামে একজন ব্লগার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটর এই ভিডিওটি ভুয়া ক্যাপশনে প্রকাশ করেন। তিনি কোনো ম্যাজিস্ট্রেট বা ভোক্তা অধিকারবিষয়ক কর্মকর্তা নন। তিনি বাজারের একজন ব্যবসায়ী। তার নাম জাকিয়া সুলতানা।
ওসি বলেন, ওই ব্যবসায়ীর (জাকিয়া) সঙ্গে নারী ব্যবসায়ীদের প্রায়ই ঝগড়াঝাটি হতো। এরই ধারাবাহিকতায় তিনি একটি ঝামেলা করেছিলেন। পরে বিষয়টি মীমাংসা না হওয়ায় তিনি মানববন্ধন করেন। মানববন্ধনে বাজার কমিটির কয়েকজন দোকানদারকে নিয়ে উচ্ছৃঙ্খল কথাবার্তা ও আচরণ করেন। এরপর বাজারের লোকজন অতিষ্ঠ হয়ে তাকে ধাওয়া দেয়। এ সময় মারধরের ঘটনাটি ঘটে।
তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। আমরা দুই পক্ষের সঙ্গেই কথা বলেছি। বিষয়টি আরও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।’
জানা যায়, শনিবার বেলা ১১টার দিকে শহরের পান্না চত্বর থেকে জাকিয়া সুলতানার নেতৃত্বে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ জন নারী একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। মিছিলটি পান্না চত্বর থেকে শুরু হয়ে ১ নম্বর রেলগেট প্রদক্ষিণ করে বড় বাজারের কাপড় মার্কেটের কাদেরিয়া সুপার মার্কেটে যায়।
সেখানে গিয়ে তারা প্রতিবাদ সমাবেশ করেন।
বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ ছিল, কাদেরিয়া মার্কেটের ‘বস্ত্র বিতান’-এর মালিক ও বস্ত্র বাজার কমিটির সাবেক সভাপতি আজিজ মন্ডল, ‘রিমঝিম বুটিক’-এর মালিক মো. খন্দকার আমিরুল এবং ‘ড্রিম ফ্যাশন’-এর মালিক কাজী নিয়ামুল হক জাকিয়া সুলতানাকে হুমকি দিয়েছেন। এর প্রতিবাদেই তারা বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেন।
সমাবেশে জাকিয়া সুলতানা কাদেরিয়া মার্কেটে অবস্থান কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেন। এ ঘোষণাকে কেন্দ্র করে মার্কেটের দোকান মালিক ও কর্মচারীদের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়। একপর্যায়ে কয়েকজন ব্যবসায়ী জাকিয়া সুলতানাকে ধাওয়া দেন। তখন তিনি মার্কেট এলাকা থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করেন। খবর পেয়ে মার্কেটের ব্যবসায়ীরা বিষয়টি পুলিশকে জানান। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়। পরে জাকিয়া সুলতানাকে নিরাপদে উদ্ধার করে রাজবাড়ী সদর থানায় নিয়ে যায়।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জাকিয়া সুলতানার ‘আস্থা পোশাক শিল্প’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সেখানে শাহানা পারভীন বৃষ্টি নামে এক নারী সেলসম্যান হিসেবে কাজ করতেন। কাজ করার সময় জাকিয়া সুলতানার সঙ্গে বৃষ্টির বিরোধ তৈরি হয়। পরে বৃষ্টি চাকরি ছেড়ে দেন। এরপর একই কাপড় বাজারে তিনি নিজেই একটি দোকান দেন।
ব্যবসায়ীদের দাবি, সাবেক কর্মচারী বৃষ্টি একই বাজারে দোকান দেওয়ায় জাকিয়া সুলতানা বিষয়টি মেনে নিতে পারেননি। বৃষ্টির দোকান বন্ধ করে দেওয়ার জন্য তিনি বস্ত্র বাজার কমিটির সভাপতি আজিজ মন্ডলের কাছে চাপ দেন বলেও ব্যবসায়ীরা দাবি করেন। আজিজ মন্ডল এতে সম্মতি না দেওয়ায় তার সঙ্গে জাকিয়া সুলতানার বাকবিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে আশপাশের কয়েকজন কাপড় ব্যবসায়ী জাকিয়া সুলতানাকে ধাক্কা দিয়ে সেখান থেকে সরিয়ে দেন।
ওই ঘটনাকে জাকিয়া সুলতানা তার ওপর হামলা ও হুমকি হিসেবে উল্লেখ করে প্রতিবাদ জানান। এর ধারাবাহিকতায় তিনি নারী কর্মীদের নিয়ে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেন।
কাপড় বাজারের একাধিক ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন, বাজারে দোকান নেওয়ার পর থেকেই জাকিয়া সুলতানা বিভিন্ন ব্যবসায়ীর সঙ্গে বিরোধে জড়িয়েছেন। তার প্রতিষ্ঠানে কর্মরত নারী কর্মচারীদের সঙ্গে অসদাচরণ এবং তাদের অনৈতিক কাজে বাধ্য করার মতো গুরুতর অভিযোগও করেন ব্যবসায়ীরা।
ব্যবসায়ীদের দাবি, শাহানা পারভীন বৃষ্টিকেও জাকিয়া সুলতানা শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করতেন। তাকে অনৈতিক কাজে বাধ্য করার অভিযোগও করেন তারা। এসব কারণেই বৃষ্টি চাকরি ছেড়ে নিজে ব্যবসা শুরু করেন বলে ব্যবসায়ীরা দাবি করেন। এরপর থেকেই বৃষ্টির দোকান বন্ধের জন্য জাকিয়া বিভিন্নভাবে চাপ সৃষ্টি করছেন বলেও তাদের অভিযোগ। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে জাকিয়া সুলতানার বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
ঘটনার পর কাদেরিয়া মার্কেটের ব্যবসায়ীরা দোকানপাট বন্ধ করে জাকিয়া সুলতানার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা ও গ্রেপ্তারের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে রাজবাড়ী সদর থানায় যান। তারা তার বিরুদ্ধে থানায় একটি অভিযোগও দেন।
ওসি উত্তম কুমার ঘোষ বলেন, বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। পুলিশ দুই পক্ষের সঙ্গেই কথা বলেছে। বিষয়টি আরও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
