সাড়ে তিন মাস আগে আফগান নাগরিক হাসমত মোহাম্মদীর দাফন হলেও মরদেহ উত্তোলনের সময় তার অক্ষত শরীর, চেহারাতেও নূরানীর ছাপ ছিল বলে মন্তব্য করেছেন হাসমতের লাশ দাফনকারী আঞ্জুমানে মুফিদুল ইসলামের উজ্জল হোসেন।
তিনি বলেছেন, ‘এখন লাশ কবর থেকে আবার উত্তোলন করা হয়েছে, সেই আগের মতই চেহারা এখনো আছে, আছে নূরানী ছাপও। একটুও বিবর্ণ হয়নি।’
গতকাল মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) তার মরদেহ কবর থেকে উত্তোলনের সময় তিনি এসব কথা বলেন।
আঞ্জুমানে মুফিদুল ইসলামের উজ্জল হোসেন বলেন, “আমি যখন আফগান নাগরিককে গোসল করাই, সেসময়ের ছোট ছোট পরিস্থিতি মনে পড়ে। উনাকে যখন গোসল করাই তখন তার চেহারাটা খুব নূরের মতো, খুব সুন্দর ছিল। এখন লাশ কবর থেকে আবার উত্তোলন করা হয়েছে, সেই আগের মতই চেহারা এখনো আছে, আছে নূরানীর ছাপও। একটুও বিবর্ণ হয়নি।
তিনি বলেন, “মরদেহটি সাড়ে তিনমাস আগে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের কাছে এসেছিল মহেশপুর থেকে। থানা থেকে আমাদের কাছে এটি হস্তান্তর করে। পরে আমরা সেটি সুন্নতি কায়দায় দাফন করি ঝিনাইদহ গুরুস্থানে। পরবর্তীতেে এই মরদেহের সন্ধান মেলে লাশটি আফগানিস্তান নাগরিকের। যখন তার পরিবার জানতে পারে মৃতদেহ ঝিনাইদহে আছে; তখন তারা জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের উপস্থিতিতে আইনগত সব প্রক্রিয়া মেনে আজ মরদেহ উঠিয়ে নিজ দেশে নিয়ে যাচ্ছে তার ভাই ইমাম মোহাম্মাদী।”
জানা গেছে, গতকাল দীর্ঘ আইনি ও দাপ্তরিক প্রক্রিয়া শেষে দাফনের প্রায় ৫ মাস পর ঝিনাইদহ পৌর কেন্দ্রীয় গোরস্থান থেকে আফগানিস্তানের নাগরিক হাসমত মোহাম্মদীর মরদেহ উত্তোলন করা হয়েছে। পরে স্বদেশে নিয়ে পারিবারিক গোরস্থানে দাফনের জন্য মরদেহটি নিহতের ছোট ভাই ইমাল মোহাম্মদীর কাছে হস্তান্তর করা হয়।
মরদেহ উত্তোলনের সময় উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মেহেদী হাসান, মেডিকেল অফিসার ডা. ফারহানা তাসনিম, তদন্ত কর্মকর্তা ও মহেশপুর থানার এসআই টিপু সুলতান, নিহতের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মাহমুদুল হাসান মাসুম, নিহতের ভাই ইমাল মোহাম্মদীসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিনিধিরা।
মরদেহ হাতে পাওয়ার পর তার ভাই ইমাল মোহাম্মদী বলেন, “অসুস্থ মায়ের অনুরোধে ভাইয়ের মরদেহ নিজের দেশের মাটিতে নিয়ে পারিবারিক গোরস্থানে দাফন করতে পারছেন এটাই তাদের জন্য বড় সান্ত্বনা। এ কাজে বাংলাদেশ সরকার, জেলা প্রশাসন, পুলিশ বিভাগ ও স্থানীয় সাংবাদিকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।”
নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মেহেদী হাসান বলেন, “আইনগত সব নিয়ম-কানুন ও প্রয়োজনীয় দাপ্তরিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেই হাসমত মোহাম্মদীর মরদেহ কবর থেকে উত্তোলন করে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।”
প্রসঙ্গত, গত ১৩ এপ্রিল ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার পলিয়ানপুর সীমান্তের ইছামতী নদী থেকে ভাসমান অবস্থায় অজ্ঞাত একটি মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ ও বিজিবি। জাতীয় পরিচয়পত্রের ডেটাবেজে পরিচয় শনাক্ত না হওয়ায় পরদিন ১৪ এপ্রিল আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলামের মাধ্যমে মরদেহটি ঝিনাইদহ পৌর কেন্দ্রীয় গোরস্থানে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়।
পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ছবি দেখে পরিবারের সদস্যরা মরদেহটি হাসমত মোহাম্মদীর বলে শনাক্ত করেন। এরপর মরদেহ দেশে ফিরিয়ে নিতে তার ভাই ইমাল মোহাম্মদী প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে প্রায় ৫৮ দিন বাংলাদেশে অবস্থান করেন। অবশেষে মন্ত্রণালয়ের অনাপত্তিপত্রসহ প্রয়োজনীয় অনুমোদন পাওয়ার পর মঙ্গলবার দাফনের ১৪০ দিন পর মরদেহ উত্তোলন করে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
গত ১৩ এপ্রিল ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার পলিয়ানপুর সীমান্তের ইছামতী নদী থেকে এক অজ্ঞাত ব্যক্তির ভাসমান মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ ও বিজিবি। পিবিআই আঙুলের ছাপ নিয়ে বাংলাদেশি জাতীয় পরিচয়পত্রের ডেটাবেজে কোনো মিল না পাওয়ায় মরদেহটি বেওয়ারিশ হিসেবে আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের মাধ্যমে ১৪ এপ্রিল ঝিনাইদহ পৌর কেন্দ্রীয় গোরস্থানে দাফন করা হয়। এ ঘটনায় মহেশপুর থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা করা হয়।
এদিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মরদেহের ছবি দেখে নিহতের স্বজনরা নিশ্চিত হন যে নিহত ব্যক্তি আফগানিস্তানের কাবুলের পাঞ্জাশির এলাকার কুন্ডুস গ্রামের ইয়াসিন মোহাম্মদী ও সকিনা মোহাম্মদী দম্পতির ছেলে হাসমত মোহাম্মদী। হাসমতের মৃত্যুর পর তার লন্ডন প্রবাসী আরেক ভাই মীর ওয়াইস মোহাম্মদী লন্ডন থেকে ঝিনাইদহে আসলেও আইনি জটিলতার কারণে মরদেহ না পেয়ে ফিরে যেতে বাধ্য হন।
এছাড়াও নিহতের দাফন হওয়ার ৪ মাস ২৪ দিন পর তার আরেক ভাই ইমাল মোহাম্মদী ভাইয়ের মরদেহ স্বদেশে ফিরিয়ে নিতে গত ৬ জুলাই ডিএনএ টেস্টের নথিপত্র, মন্ত্রণালয়ের চিঠি, পরিচয়পত্র ও প্রমাণাদিসহ ঝিনাইদহে আসেন।
