ঢাকার সাভারে মারকাযুল উলুম আশ-শরইয়্যাহ নামে মাদরাসায় সাত বছর বয়সী শিশুকে যৌন নির্যাতনের (বলাৎকার) অভিযোগ ওঠা ১০ শিক্ষক-ছাত্রকে গ্রেফতারে অভিযান চালায় পুলিশ। তবে মামলার ৮ দিন পর অভিযানে আসামিদের কাউকেই গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) দুপুর আড়াইটা থেকে সাড়ে তিনটা পর্যন্ত প্রায় এক ঘণ্টা ধরে উপজেলার পূর্ব শাহীবাগ এলাকায় মাদরাসাটিতে এ অভিযান পরিচালনা করা হয়।
পুলিশ জানায়, সাভার মডেল থানার পুলিশ পরিদর্শক (ওসি অপারেশন) আব্দুস সবুরের নেতৃত্বে পুলিশের দুটি টিম মাদরাসায় যায়। মাদরাসার মক্তব শাখায় শিক্ষার্থী ও উপস্থিত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন ও অভিযোগ ওঠা ছাত্রদের নথিপত্র যাচাই করেন। শিক্ষকদের বিষয়ে খোঁজখবর নেন। এ সময় অভিযুক্ত ছাত্র ও শিক্ষকরা পলাতক রয়েছেন বলে সেখানে উপস্থিতরা জানান। দীর্ঘ সময় সেখানে উপস্থিত শেষে তারা ফিরে আসেন।
এ বিষয়ে ঢাকা জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম, অপারেশন ট্রাফিক উত্তর) মো. জাহাঙ্গীর আলম গণমাধ্যমকে বলেন, প্রথমে ভুক্তভোগী পরিবার আমাদের থানায় আসেনি, এই বিষয়টি আপনাদের স্পষ্ট করা দরকার। সেই পরিবার আদালতে যখন বিষয়টি নিয়ে যান, তখন আদালতের নির্দেশে সাভার মডেল থানায় আমরা মামলাটি রুজু করা হয়।
তিনি বলেন, মামলা রুজু করার পরপরই আসামিদের অবস্থান শনাক্ত করার জন্য আমাদের একাধিক গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করা হয়। একইসঙ্গে আমরা আসামিদের গ্রেফতার করার জন্য অভিযান পরিচালনা করি। কিন্তু আজকে আসামিদের পাওয়া যায়নি, তারা পলাতক রয়েছে। তবে তাদের গ্রেফতার করার জন্য গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করে অভিযান অব্যাহত আছে। আমরা ইতোমধ্যে আসামিদের গ্রেফতার করার জন্য অভিযান পরিচালনা করেছি। আসামিরা যেহেতু পলাতক রয়েছে, তাদের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে আমরা অভিযান অব্যাহত রেখেছি। খুব দ্রুত আমরা তাদের গ্রেফতার করতে সক্ষম হবো।
এদিকে পুলিশের অভিযানে এখনও আসামি গ্রেফতার না হওয়ায় মামলার বাদি ভুক্তভোগী শিশুর বাবা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) সাভার মডেল থানায় গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন।
তিনি বলেন, আমার ছেলেকে দীর্ঘ ছয় মাস ৬-৭ জন ছাত্র ও শিক্ষক মিলে বলাৎকার করেছে। আমার ছেলে অসুস্থ। আমি এ ঘটনায় মাদরাসার মোহতামিমের জিয়া বিন কাশেমের কাছেও বিচার দিয়েছিলাম। তিনি অপরাধীদের আইনের হাতে তুলে না দিয়ে পালাতে সাহায্য করেছেন। বিষয়টি নিয়ে তিনি আমাকে চুপ থাকতে বলেন ও পরবর্তীতে হুমকিও দেন। এ ঘটনায় চিকিৎসা শেষে আমার ছেলেকে নিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হই।
ভুক্তভোগীর বাবা আরও বলেন, আদালত সাভার থানাকে মামলা নেওয়ার আদেশ দেন। মামলায় মাদরাসার মোহতামিমসহ ১০ জনকে আসামি করা হয়। দীর্ঘ দিন পেরিয়ে গেলেও এখনও পুলিশ একজন আসামিও গ্রেফতার করতে পারেনি। পুলিশ শুরুতেই অভিযান চালালে সব আসামি গ্রেফতার করতে পারতো। পুলিশের পক্ষ থেকে আমাকে এমনও বলা হয়েছে, মামলার একজন আসামি সাদপন্থি নেতা হওয়ায় ওই মাদরাসায় অভিযান চালানো যাবে না। চালালে উল্টো থানায় আক্রমণ হতে পারে। দীর্ঘ দিন পরে হলেও পুলিশ আজ মাদরাসায় অভিযান চালিয়েছে। কাউকে আটক করতে পারেনি। পুলিশের কাছে আমার দাবি, অতি দ্রুত মামলার সব আসামি গ্রেফতার করা হোক ও আইনের আওতায় আনা হোক।
শিশুটির বাবা জানান, তার সন্তান ওই মাদরাসায় আবাসিক থেকে পড়াশোনা করে। সম্প্রতি সে বাড়ি ফিরে মনমরা হয়ে পড়ে ও মাদরাসায় ফিরতে অস্বীকৃতি জানায়। একপর্যায়ে মাদরাসার অপর শিক্ষার্থীর অভিভাবকের কাছে তিনি জানতে পারেন, সেখানে শিশু শিক্ষার্থীদের বলাৎকারের অভিযোগ রয়েছে এবং কয়েক দিন আগে এ নিয়ে মাদরাসায় বিচারও হয়েছে।
এরপর তিনি ছেলেকে বাড়িতে নিয়ে আসেন। গত ১৪ আগস্ট শিশুটি পরিবারের সদস্যদের কাছে তাকে বলাৎকারের শিকার হওয়ার কথা জানায় বলে দাবি করেন তার বাবা।তার অভিযোগ, চলতি বছরের ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে ৬ জুলাই পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে মাদরাসার শিক্ষক ও শিক্ষার্থী তার ছেলেকে বলাৎকার করে।
এরপর তিনি মাদরাসার পরিচালক জিয়া বিন কাশেমের কাছে বিষয়টি নিয়ে অভিযোগ করেন। অভিযুক্ত শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলেও পরদিন তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং বিষয়টি নিয়ে চুপ থাকতে তাকে নির্দেশ দেওয়া হয় এবং হুমকি দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
এদিকে শিশুটি অসুস্থ হয়ে পড়লে পরিচিত এক চিকিৎসকের পরামর্শ নেন তার বাবা। ওই চিকিৎসক শিশুটিকে পরীক্ষা করে দ্রুত সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করার পরামর্শ দেন। গত ১৮ আগস্ট শিশুটিকে সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে সেখানকার চিকিৎসকেরা তাকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) নেওয়ার পরামর্শ দেন। ওই দিনই শিশুটিকে ওসিসিতে নেওয়া হয় এবং সেখানে চার দিন ভর্তি রেখে চিকিৎসা দেওয়া হয় বলে জানান তার বাবা।
পরে পরিচিত এক আইনজীবীর মাধ্যমে আদালতে মামলা দায়ের করা হয়। আদালত শিশুটির জবানবন্দি গ্রহণ করে সাভার মডেল থানাকে মামলা গ্রহণের নির্দেশ দেন। এরপর গত ২৬ আগস্ট থানায় মামলাটি নথিভুক্ত করা হয়। তবে এখনও কোনো আসামিকে গ্রেফতার করা হয়নি বলে অভিযোগ করেন শিশুটির বাবা।
মামলায় পাঁচ শিক্ষার্থী ও এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে সরাসরি বলাৎকারের অভিযোগ আনা হয়। বাকি চারজনের বিরুদ্ধে বলৎকারে সহযোগিতা, অপরাধীদের পালিয়ে যেতে সহায়তা করা, ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ আনা হয়েছে। গত ২৬ আগস্ট সাভার মডেল থানায় মামলাটি রুজু করে।
