
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ১৮ মাস পার হলেও চট্টগ্রামে হওয়া মামলাগুলোর তেমন অগ্রগতি নেই। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর তদন্ত আরো ধীর হয়েছে বলে অভিযোগ স্বজনদের। নিহতদের পরিবারগুলো বলছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অন্তত বিভিন্ন দপ্তর থেকে খোঁজ নেওয়া হতো, নতুন সরকার আসার পর সেই খোঁজখবর নেওয়াও বন্ধ হয়ে গেছে।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জুলাইয়ের ঘটনায় চট্টগ্রামে হওয়া মামলার তদন্ত এগোচ্ছে না, হাজির করা যাচ্ছে না সাক্ষী। ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা বা পুনর্বাসনও করা হয়নি। এছাড়া নতুন সরকার আসার পর তাদের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয়নি জুলাই শহীদদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ।
২০২৪ সালের ১৬ জুলাই চট্টগ্রামের মুরাদপুর এলাকায় আ.লীগের সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্রদল নেতা শহীদ ওয়াসিম আকরাম। তার বাড়ি কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার সদর ইউনিয়নের বাঘগুজারা বাজার পাড়ায়। তিনি চট্টগ্রাম কলেজে স্নাতক (সম্মান) চতুর্থ বর্ষে পড়তেন। ওয়াসিম পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে তৃতীয়।
ওয়াসিম হত্যার একমাস পর ১৯ আগস্ট চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ থানায় মামলা করেন মা জোৎস্না বেগম। মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনা, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাসান মাহমুদ, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ ২৫০ জনকে আসামি করা হয় মামলায়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ছাত্ররা শহীদ ওয়াসিম আকরামের বাড়িতে গেছেন। বিএনপি সরকার আসার পর এখনো কেউ খোঁজ নেয়নি বলে অভিযোগ করেছেন ওয়াসিমের মা।
গতকাল সোমবার শহীদ ওয়াসিম আকরামের মা জোৎসা বেগমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমাদের চকরিয়ার এমপি কোনোদিন বাড়িতে আসেনি। নির্বাচনের আগে শুধু কয়েকটি অনুষ্ঠানে আমার স্বামীকে নিয়ে গেছে। আমার ছেলেটা তো আর কোনোদিন ফিরে আসবে না। কিন্তু যারা ওকে কেড়ে নিল, তাদের বিচার যেন আমার জীবদ্দশায় দেখি এইটাই এখন আমার একমাত্র চাওয়া। সে পড়ালেখা করে মানুষ হতে চেয়েছিল। সেই স্বপ্নটাই শেষ হয়ে গেল।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিএনপির শপথ অনুষ্ঠানে আমার স্বামীকে ঢাকায় নিয়ে গেছিল, কিন্তু এক গ্লাস পানিও দেয়নি। রাতে বসায় রেখেছিল। আমার স্বামী ডায়াবেটিস রোগী ছিলেন। নতুন সরকার আসার পর কেউ বাসায় আসা দূরে থাক একটা কলও দেয়নি। এখন সন্দেহ জাগছে, আমার ছেলে হত্যার বিচার হবে তো?
একই দিন একই সময়ে শহীদ হন ফয়সাল আহমেদ শান্ত। তিনি চট্টগ্রামের ওমরগনি এমইএস কলেজের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র ছিলেন।
শান্তর মা কহিনুর আক্তার বলেন, বিএনপির শপথ অনুষ্ঠানে আমাকে নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সেখানে খোলা জায়গায় রোদে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। পরে বাধ্য হয়ে আমরা চলে আসি। নতুন সরকার আসার পর কেউ একবার খোঁজ নিল না। বিএনপি সরকারের আচরণ দেখলে বোঝাই যায় তারা কতটা আন্তরিক। যাদের রক্তের বিনিময়ে এই সরকার এসেছে, তারা যদি শেষ পর্যন্ত আমাদের সঙ্গেই গাদ্দারি করে, তাহলে আমরা কোথায় যাব? এখন আর বিচার আশা করি না।
তিনি আরো বলেন, যেদিন শান্তকে হারাই, সেদিনই আমাদের ঘরটা ভেঙে যায়। এতদিন ধরে শুধু বিচারের আশ্বাসই শুনছি। নতুন সরকার আসার পর ভেবেছিলাম কেউ হয়তো পাশে দাঁড়াবে। কিন্তু কেউই আসেনি। মনে হয়, আমার সন্তানের রক্তের দাম কারো কাছে নেই।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আ.লীগ সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর সন্তান ওমর নুরুল আবছার। তার মা রুবি আক্তার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ছেলেকে হারিয়েছি দেড় বছর হলো। প্রথম দিকে পুলিশ-প্রশাসনের লোকজন এসেছে, আশ্বাস দিয়েছে। কিন্তু নতুন সরকার আসার পর কেউ আর খোঁজ নেয় না। মামলার কী হলো, তদন্ত কতটুকু হয়েছে কেউ কিছু বলে না। আমার ছেলে হত্যার বিচারের জন্য যদি প্রয়োজন হয় আবার রাস্তায় নামব।
আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের গুলিতে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট গুরুতর আহত হন ফেনীর ছাগলনাইয়ার আবদুল হক চৌধুরী ডিগ্রি কলেজের ছাত্র মাহবুবুল আলম মাসুম। তার মাথা, বুক ও পিঠে গুলি লাগে। পরে তাকে চট্টগ্রামের পার্কভিউ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ৭ আগস্ট তার অবস্থা আশঙ্কাজনক দেখে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। ওইদিন সন্ধ্যায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
মাসুমের ভাই মাহমুদুল হাসান বলেন, আমাদের পরিবারের জন্য এই ক্ষতি অপূরণীয়। মাহবুবুল শুধু পড়াশোনা করছিল, কোনো রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিল না। আমরা চাই বিচারের ব্যবস্থা হোক। কিন্তু দেড় বছর পার হলেও এখনো কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। নতুন সরকার এসেছে, অথচ কেউ আমাদের খোঁজও নেয়নি।
পুলিশ ও আদালত সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রামের ১৫১ মামলার মধ্যে ৬৯টি হয়েছে নগর ও জেলার ৯টি থানায়। বাকিগুলো আদালতে দায়ের হওয়া নালিশি মামলা (সিআর)। এসব মামলায় নাম উল্লেখ থাকা আসামির সংখ্যা ১৩ হাজার ৪৫০। অজ্ঞাত পরিচয় আসামির সংখ্যা অন্তত ৩০ হাজার। আসামিদের মধ্যে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীর নাম যেমন রয়েছে, তেমনি আবার রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নন এমন ব্যক্তি, ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন পেশার মানুষও রয়েছেন।
পুলিশ সূত্র জানায়, চট্টগ্রামে থানায় হওয়া ৬৯টি মামলায় মোট আসামি ২১ হাজার ৯০৬ জন। মামলাগুলোর মধ্যে ১৫টি হত্যা মামলা। তদন্ত শেষ হওয়া একটি মামলার প্রতিবেদন দেওয়া হয়।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারী কমিশনার (মিডিয়া) আমিনুর রশিদ বলেন, একটি মামলায় প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। বাকিগুলো মামলা এখনো তদন্তাধীন।




