টিসিবির পণ্য নিতে হাহাকার

লম্বা লাইন, ক্লান্ত মুখ, রোদে পুড়ে অপেক্ষা, আর শেষ পর্যন্ত অনিশ্চয়তা—পণ্য মিলবে তো? মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) বেলা ১১টার আগেই জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন শারমিন সুলতানা নামের এক বৃদ্ধা। তেজতুরি বাজার এলাকা থেকে সমবয়সী আফরোজা আক্তারকে নিয়ে এসেছেন তিনি।আফরোজার বুকে ব্যথা, তাই লাইনের পাশে বসে ছিলেন বেশির ভাগ সময়। শারমিন দাঁড়িয়ে ছিলেন টানা পাঁচ ঘণ্টা।

বিকেল চারটার কিছু আগে হাতে আসে কাঙ্ক্ষিত টোকেন। তবু পণ্য পেতে অপেক্ষা তখনো বাকি।

“মাল নিতে গিয়ে জোহরের নামাজ মিস গেছে,” গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে বলতে বলছিলেন শারমিন। “এখন বিকেল হয়ে গেছে, আসরের নামাজও মিস হবে।” একটু থেমে নিজেকে সান্ত্বনা দেন, “তাও তো টোকেন পেয়েছি, মাল পাব।”

রমজান উপলক্ষে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে সারা দেশে ট্রাকে করে ভর্তুকি মূল্যে পণ্য বিক্রি শুরু করেছে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)। চলবে ১২ মার্চ পর্যন্ত।

টিসিবি থেকে একজন ক্রেতা সর্বোচ্চ দুই লিটার সয়াবিন তেল, দুই কেজি করে মসুর ডাল ও ছোলা, এক কেজি চিনি এবং আধা কেজি খেজুর কিনতে পারেন। দামও বাজারের তুলনায় অনেক কম—সয়াবিন তেল ১০০–১১৫ টাকা লিটার, চিনি ৭০–৮০ টাকা, ডাল ৬০–৭০ টাকা, ছোলা ৬০ টাকা এবং খেজুর ১৫৬–১৬০ টাকা। যেখানে বাজারে এসব পণ্যের দাম প্রায় দ্বিগুণ।

এই সাশ্রয়ের আশাতেই ভোর থেকে রাজধানীর বিভিন্ন মোড়ে জড়ো হন মানুষ। কিন্তু বরাদ্দ সীমিত—প্রতিটি ট্রাকে ৪০০ জনের জন্য পণ্য। বাস্তবে উপস্থিতি থাকে দ্বিগুণ থেকে চারগুণ।

হুড়োহুড়ি, ধাক্কাধাক্কি, মারামারি

সংসদ ভবনের সামনে বুধবার দুপুরেই লাইনে ছিলেন হাজারের বেশি মানুষ। টোকেন পাননি অনেকে। কারওয়ান বাজারে বেলা ১১টায় ট্রাক পৌঁছানোর আগেই দেড় থেকে দুইশ মানুষ দাঁড়িয়ে ছিলেন। দুপুর ২টার মধ্যে পণ্য শেষ। অন্তত ১০০ জন ফিরে যান খালি হাতে।

দুদিনে রামপুরা, মালিবাগ, মৌচাক, কারওয়ান বাজার ও বিজয় সরণিসহ ১০টি স্থানে ঘুরে একই চিত্র দেখা গেছে—হুড়োহুড়ি, ঠেলাঠেলি, চিৎকার-চেঁচামেচি, এমনকি হাতাহাতি।

মৌচাকে সত্তরোর্ধ্ব শামুসুন্নাহার মাহমুদা বলেন, ‘আমাগো গায়ে জোর নাই। তিনদিন ধরে ঘুরছি, ধাক্কাধাক্কি করে সিরিয়াল নিতে পারিনি।’

খালেদ মাহমুদ রাসেল নামের আরেক বয়স্ক ব্যক্তি বলেন, ‘গাড়ি আসার আগে সামনে ছিলাম। পরে টোকেন পেলাম ৭৬ নম্বর। পাবো কি না বুঝতেছি না।’

নারীদের লাইনে বিশৃঙ্খলা আরও প্রকট। কারওয়ান বাজারে টোকেন নেওয়া নিয়ে দুই নারীর মধ্যে হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে।

মরিয়ম নামের এক নারী অভিযোগ করেন, ‘পেছন থেকে ধাক্কা দিয়ে টোকেন নিয়ে গেছে। দল বেঁধে আসে, বিশৃঙ্খলা করে।’

সুমি নামের আরেক নারী বলেন, ‘যারা টোকেন দেন তারাও স্বজনপ্রীতি করেন। পরিচিত লোকদের আগের সিরিয়াল দেন।’

অভিযোগ রয়েছে, টোকেন বিতরণ ঘিরে চাপ তৈরি করে কিছু প্রভাবশালী গোষ্ঠী। ডিলারদেরও হিমশিম খেতে হয়। আদ্রিক ইন্টারন্যাশনালের পলাশ উদ্দিন বলেন, ‘বাজারে তেল পাওয়া যায় না, সবকিছুর দাম চড়া। এখানে অর্ধেক দামে দিই। তাই একরকম যুদ্ধ শুরু হয়। বরাদ্দের চেয়ে মানুষ অনেক বেশি।’

সংসদ ভবনের সামনে বিক্রি কার্যক্রম পরিচালনাকারী এক প্রতিনিধি বলেন, ‘রমজানে চাহিদা বাড়ে। লাইন ঠিক রাখা কঠিন হয়ে যায়। বরাদ্দ বাড়ানো গেলে বেশি মানুষকে দেওয়া যেত।’

টিসিবি জানায়, সারা দেশে ৪৫০টি ভ্রাম্যমাণ ট্রাকের মাধ্যমে প্রতিদিন (ছুটির দিন ছাড়া) পণ্য বিক্রি হচ্ছে। প্রায় ৩৫ লাখ ভোক্তার কাছে ২৩ হাজার টন পণ্য পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় ৫০টি, চট্টগ্রামে ২০টি, অন্য সাতটি মেট্রোপলিটন এলাকায় ১৫টি করে এবং বাকি ৫৫ জেলায় ৫টি করে ট্রাক বিক্রি করছে।

টিসিবির মুখপাত্র ও উপপরিচালক (বাণিজ্যিক) মো. শাহাদত হোসেন বলেন, ‘আমাদের ট্রাক সেলের নির্দিষ্ট কোনো সময় বাধা নেই। শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিক্রি কার্যক্রম চলমান থাকবে।’

কিন্তু বাস্তবতা হলো—লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা সবার ভাগ্যে পণ্য জোটে না। বিশেষ করে বয়স্ক ও শারীরিকভাবে দুর্বল মানুষরা ধাক্কাধাক্কিতে টিকতে পারেন না।

তবু যারা পণ্য পান, তাদের চোখে-মুখে ফুটে ওঠে স্বস্তি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নারী বলেন, ‘এত কষ্ট হইলেও জিনিসগুলো পাইছি। বাজারে কিনতে গেলে পারতাম না। এখন রোজার বাজার নিয়ে একটু নিশ্চিন্ত।’

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বাজারে টিসিবির ট্রাক যেন নিম্ন আয়ের মানুষের শেষ ভরসা। পাঁচ ঘণ্টার লাইনে দাঁড়িয়ে হাতে ধরা ছোট্ট টোকেন—আলেয়া বেগমদের কাছে সেটিই রমজানের স্বস্তি, সংসারের সাশ্রয়, আর কঠিন সময়ের মধ্যে একটুখানি জয়ের অনুভূতি।

সৌজন্যে : আরটিএনএন

Jubokantho24 Ad
এ জাতীয় আরো সংবাদ
এ জাতীয় আরো সংবাদ