
অক্সফোর্ড ইউনিয়ন কোনো ভাড়ার হল নয়—সাদিক-হাসনাত ইস্যুতে ওঠা বিতর্ক ও নানা মন্তব্যের প্রেক্ষাপটে এমন ব্যাখ্যা দিয়েছেন সাবেক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও ‘অক্সফোর্ড প্যারেন্ট’ মিয়া মোহাম্মদ তারুণ।
আজ সোমবার (১৫ জুন) নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে তিনি বলেন, ‘আমি একজন অক্সফোর্ড প্যারেন্ট বলছি। গতকাল অক্সফোর্ড ইউনিয়নে জুলাই বিপ্লব নিয়ে অনুষ্ঠিত অনুষ্ঠানের প্রসঙ্গে নানা ধরনের জল্পনা-কল্পনা ছড়ানোর চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। কেউ বলছেন এটি নাকি শুধুই একটি ‘স্পেস ভাড়া’ নিয়ে করা অনুষ্ঠান, কেউ আবার এমনভাবে বিষয়টি উপস্থাপন করছেন যেন অক্সফোর্ড ইউনিয়নের সঙ্গে এর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্কই ছিল না।’
তিনি বলেন, সমস্যাটি হলো এসব বক্তব্যের অধিকাংশই অক্সফোর্ড ইউনিয়ন কী, কীভাবে কাজ করে এবং কোন ধরনের অনুষ্ঠান আয়োজন করে—সেই মৌলিক বিষয়গুলো সম্পর্কে অজ্ঞতা অথবা ইচ্ছাকৃত ভ্রান্তি ছড়ানো।
তিনি আরও বলেন, আমি একজন অক্সফোর্ড প্যারেন্ট। সংগত কারণেই অক্সফোর্ডের বিভিন্ন কার্যক্রম ও প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে কিছুটা কাছ থেকে জানার সুযোগ হয়েছে। তাই যখন দেখি কেউ অক্সফোর্ড ইউনিয়নকে প্রায় কমিউনিটি সেন্টারের হলরুম বা জন্মদিনের পার্টির ভেন্যুর পর্যায়ে নামিয়ে আনার চেষ্টা করছেন, তখন বিস্মিত হই—এবং কিছুটা বিনোদিতও হই।
স্ট্যাটাসে তিনি উল্লেখ করেন, অক্সফোর্ড ইউনিয়ন কোনো সাধারণ অডিটোরিয়াম বা ভাড়ার হল নয়। এটি বিশ্বের অন্যতম ঐতিহাসিক ও প্রভাবশালী বিতর্ক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্ল্যাটফর্ম। প্রায় দুই শতাব্দী ধরে বিশ্ব রাজনীতি, গণতন্ত্র, মানবাধিকার, যুদ্ধ, শান্তি, বিজ্ঞান, সংস্কৃতি এবং সামাজিক পরিবর্তন নিয়ে এখানে আলোচনা হয়ে আসছে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট, নোবেল বিজয়ী, বিপ্লবী নেতা, মানবাধিকারকর্মী এবং বিশ্বখ্যাত চিন্তাবিদরা এই মঞ্চে বক্তব্য দিয়েছেন।
তিনি বলেন, অক্সফোর্ড ইউনিয়নের মূল উদ্দেশ্যই হলো বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসা। কোনো বিষয় আন্তর্জাতিক গুরুত্ব অর্জন করলে, গণতন্ত্র, মানবাধিকার, রাজনৈতিক রূপান্তর বা সামাজিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে তাৎপর্য বহন করলে, সেটি ইউনিয়নের আলোচনার বিষয় হওয়া অস্বাভাবিক নয়; বরং সেটিই স্বাভাবিক।
তিনি আরও বলেন, সেরকমই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট বাংলাদেশের জুলাই বিপ্লব যা নিয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরে আলোচনা যত বাড়ছে, কিছু মানুষকে ততই অস্বস্তিতে পড়তে দেখা যাচ্ছে।
স্ট্যাটাসে বলা হয়, একটি ছাত্র-জনতার আন্দোলন, যা একটি দীর্ঘস্থায়ী কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়, রাষ্ট্র ও রাজনীতির গতিপথ বদলে দেয় এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম, নীতিনির্ধারক ও গবেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এমন একটি ঘটনা কেন অক্সফোর্ড ইউনিয়নের আগ্রহের বিষয় হবে না? বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গণতান্ত্রিক আন্দোলন, নাগরিক প্রতিরোধ এবং রাজনৈতিক রূপান্তর নিয়ে অক্সফোর্ড ইউনিয়নে অতীতেও অসংখ্য আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশের জুলাই বিপ্লবও সেই ধারারই একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ফলে এই বিষয় নিয়ে আলোচনা হওয়া কোনো ব্যতিক্রম নয়; বরং অক্সফোর্ড ইউনিয়নের ঐতিহাসিক ভূমিকার সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ।
তিনি আরও বলেন, যারা বিষয়টিকে শুধু “হল ভাড়া” তত্ত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চান, তাদের কাছে বিনীত প্রশ্ন যদি বিষয়টি এতটাই সহজ হতো, তাহলে পৃথিবীর হাজার হাজার রাজনৈতিক সংগঠন, লবিস্ট গ্রুপ এবং বিত্তশালী ব্যক্তি প্রতিদিন অক্সফোর্ড ইউনিয়নের ব্যানারে নিজেদের অনুষ্ঠান আয়োজন করতেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ফেসবুকের কমেন্ট সেকশনে তৈরি হওয়া তত্ত্ব আর শতবর্ষী প্রতিষ্ঠানের কার্যপ্রণালী এক জিনিস নয়। একটি বিষয়কে আলোচনার জন্য গ্রহণ করা এবং একটি অনুষ্ঠানকে ইউনিয়নের প্ল্যাটফর্মে স্থান দেওয়া দুটি বিষয়ই নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া, মূল্যায়ন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।
মতভেদ থাকতে পারে, রাজনৈতিক অবস্থান ভিন্ন হতে পারে; কিন্তু তথ্যের জায়গায় কল্পনা, বাস্তবতার জায়গায় গুজব এবং যুক্তির জায়গায় ঈর্ষা বসিয়ে দিলে সত্য বদলে যায় না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
স্ট্যাটাসের শেষাংশে বলা হয়, বাংলাদেশের জুলাই বিপ্লব আজ আন্তর্জাতিক একাডেমিক, রাজনৈতিক ও নীতিনির্ধারণী পরিসরে আলোচনার বিষয়। অক্সফোর্ড ইউনিয়নের মতো একটি বিশ্বখ্যাত প্ল্যাটফর্মে সেটি আলোচিত হওয়া বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি। এটি কারও ব্যক্তিগত অর্জনের প্রশ্ন নয়; এটি বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে বিশ্বের সামনে তুলে ধরার প্রশ্ন।
‘এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে জুলাই আন্তর্জাতিক মহলে আরও এক ধাপ স্বীকৃতি পেল, গবেষণা ও আলোচনার জন্য উন্মুক্ত হলো। আর এ কারণেই কিছু মানুষের আপত্তি অনুষ্ঠানটির আয়োজন নিয়ে নয়; আপত্তি হলো জুলাই এখনও আলোচনায় আছে, স্বীকৃতি পাচ্ছে এবং ইতিহাসে নিজের জায়গা তৈরি করে নিচ্ছে এটাই হচ্ছে ফ্যাসিবাদের ধূসরদের গাত্রজ্বালার অন্যতম কারণ বলেও তিনি উল্লেখ করেন।’