বাংলাদেশের কোন জেলায় সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত হয়?

বাংলাদেশে এক দশকে বজ্রপাতে সাড়ে তিন হাজারের বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। দশ বছর আগে এটিকে জাতীয় দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করা হলেও প্রাণহানি থেমে নেই। এখনও প্রায় প্রতি বছরই বাংলাদেশে শতাধিক মানুষ বজ্রপাতে প্রাণ হারাচ্ছেন।

বাংলাদেশে সাধারণত মার্চ, এপ্রিল ও মে মাসে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক বজ্রঝড়-বজ্রপাত হয় এবং এই দুর্যোগ সবচেয়ে বেশি হয় দেশের উত্তর-পূর্ব দিকের অঞ্চল সিলেটে। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, বজ্রপাতে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে সিলেট বিভাগে।

সর্বশেষ গত ২৬শে এপ্রিল দেশের কয়েকটি জেলায় বজ্রপাতে অন্তত ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে।

আবহাওয়া অফিসের সূত্রানুযায়ী, বাংলাদেশের সিলেটের সুনামগঞ্জ জেলায় সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত হয়। উপজেলার মধ্যে জামালগঞ্জ উপজেলাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত। গত এক দশকে বজ্রপাতে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে এই উপজেলাতেই।

এর বাইরে নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, মৌলভীবাজার, রাজশাহী, যশোর, কুষ্টিয়া, সাতক্ষীরা, মেহেরপুর, ফরিদপুর, মাদারীপুর, টাঙ্গাইল, কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ, বান্দরবান, রাঙ্গামাটি, বরিশালের খেপুপাড়াসহ আরও কিছু এলাকায় তুলনামূলক বেশি বজ্রপাত হয়।

মূলত, ভৌগোলিক অবস্থান ও আবহাওয়াগত বৈশিষ্ট্যের কারণে সিলেটে বজ্রপাত বেশি ঘটে।

এর ব্যাখ্যায় আবহাওয়াবিদ আবুল কালাম মল্লিক বলেন, “জলীয় বাষ্প সমৃদ্ধ এলাকার আশেপাশেই বজ্রপাত বেশি হয়। এক্ষেত্রে সিলেট অঞ্চলে বড় বড় হাওড় রয়েছে, যা থেকে প্রচুর জলীয়বাষ্প তৈরি হয়। একই সঙ্গে বঙ্গোপসাগর থেকে আসা জলীয়বাষ্প সমৃদ্ধ বাতাস দক্ষিণ-পশ্চিম দিক দিয়ে সিলেট অঞ্চলে প্রবেশ করে। এই আর্দ্র বাতাস সিলেটের উত্তর-পূর্ব দিকের পাহাড়ের সঙ্গে সংঘর্ষে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে দ্রুত উপরের দিকে উঠে যায়।”

এই উর্ধ্বগামী আর্দ্র বাতাস ঠান্ডা হয়ে ঘনীভূত হলে মেঘ তৈরি হয়, বিশেষ করে কিউমুলোনিম্বাস বা বজ্রমেঘ। এই প্রক্রিয়াই বজ্রঝড় ও বজ্রপাতের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে।

এছাড়া, উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে আসা শুষ্ক ও গরম বাতাসের সঙ্গে বঙ্গোপসাগর থেকে আসা আর্দ্র বাতাসের সংঘর্ষও বজ্রপাতের একটি বড় কারণ।

এই দুই ধরনের বাতাসের মিলনস্থল হিসেবে সিলেটসহ উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং দেশের কিছু উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় জেলা বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।

অন্যদিকে, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় পাহাড়ি অঞ্চল এবং হিমালয়ের পাদদেশ ঘিরে যে আবহাওয়াগত ব্যবস্থা তৈরি হয়, তার প্রভাবও বাংলাদেশে পড়ে।

এসব অঞ্চল থেকে তৈরি হওয়া বজ্রমেঘ পশ্চিমবঙ্গ হয়ে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, কুষ্টিয়া, যশোরসহ বিভিন্ন জেলায় প্রবেশ করে এবং স্থানীয় জলীয় বাষ্পের সঙ্গে মিশে আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

সব মিলিয়ে, হাওড়ের জলীয় বাষ্প, পাহাড়ের বাধা, এবং ভিন্ন ধরনের বায়ুপ্রবাহের সংঘর্ষ– এই তিনটি প্রধান কারণে সিলেট ও আশপাশের এলাকায় বজ্রপাতের প্রবণতা বেশি দেখা যায়।

আবহাওয়া অফিসের তথ্যগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত কয়েক বছরে বজ্রপাত দেশের প্রায় সব জেলাতেই প্রভাব ফেলেছে এবং আক্রান্ত জেলার সংখ্যা মোটামুটি স্থিতিশীল রয়েছে।

২০১৫ সালে দেশের ৪৫ ও ২০১৬ সালে ৫৭ জেলায় বজ্রপাত হয়েছিলো। ২০১৭ সালে জেলার সংখ্যা বেড়ে ষাটে দাঁড়ালেও ২০১৮ সালে তা কিছুটা কমে পঞ্চাশে নেমে আসে।

এর পরের বছর দেশের ৫৬টি জেলায় বজ্রপাতের প্রভাব দেখা গেছে এবং সে বছর চার শতাধিক নিহতের পাশাপাশি মোট ১০৮ জন নিহতও হয়েছে। আর ২০২০ সালে তো দেশের ৫৯টি জেলায় সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষ নিহত হয়েছিলো এবং আহত হয়েছিলো ৮৮ জন।

এছাড়া, ২০২১ সালে ৫৭টি জেলায় ১২৪ জন, ২০২২ সালে ৫৮টি জেলায় ৮৭ জন, ২০২৩ সালে ৫৬টি জেলায় ৬১ জন, ২০২৪ সালে ৬৪টি জেলায় ৫৩ জন আহত হয়েছিলো।

সামগ্রিকভাবে বলা যায়, বজ্রপাতের ভৌগোলিক বিস্তৃতি কমেনি, বরং কিছুটা বেড়েছে; তবে সাম্প্রতিক বছরগুলো বিবেচনা করলে দেখা যায়, বজ্রপাতের ফলে হতাহতের সংখ্যা কমতির দিকে।

Jubokantho24 Ad
এ জাতীয় আরো সংবাদ
এ জাতীয় আরো সংবাদ