বিকেএম-এর রাজনীতি ও একজন মাহবুবা হাকিম এমপি

|| মাওলানা মামুনুল হক ||

চলমান রাজনীতিতে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস তার অবস্থান চূড়ান্ত করতে যে বিষয়গুলোর প্রতি বিশেষ নজর দিয়েছে তার মধ্যে গুরুত্বের বিবেচনায় রয়েছে-

১) জুলাই চেতনাকে ধারণ করা ও জুলাই চেতনার ভিত্তিতে আগামীর বাংলাদেশের রাজনীতি বিনির্মাণ করা।

২) বড় দলগুলোর বাইরে রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে অন্যান্য দলগুলোকে স্পেস দেয়ার ক্ষেত্রে দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি।

৩) দলের পরিচিতি ও জনসম্পৃক্ততা বৃদ্ধি করা।

উপরোক্ত তিনটি বিবেচনাতেই বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসকে ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের পক্ষে থাকতে হয়েছে দ্বিধাহীনভাবে। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের পক্ষ থেকে ২৪টি আসনে নির্বাচন করে-

ক) সাড়ে ১৫ লক্ষ ভোট পেয়েছে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস। যা কাস্টিং ভোটের ২.০৯ শতাংশ।

খ) দুটি আসনে বিজয়ী হয়েছে।

গ) আরো তিনটি আসনের ব্যবধান সামান্য।

ঘ) চারটি আসনে লক্ষাধিক ভোট পেয়েছে।

ঙ) সারাদেশে দলীয় প্রতীক রিক্সার ব্যাপক প্রচার ও জনপ্রিয়তা অর্জন হয়েছে । এগুলো ছিল বিগত নির্বাচনে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের অর্জন। সেই সাথে

চ) গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবি আদায়সহ দেশ ও জনগণের পক্ষে স্বোচ্চার ভূমিকা পালন করার রাজনৈতিক সুযোগ।

ছ) গণভোটের রায় অনুযায়ী উচ্চকক্ষ গঠিত হলে ন্যূনতম দুইজন সিনেটর ও

জ) সংরক্ষিত মহিলা আসনে একজন সংসদ সদস্য পেয়েছে।

১১ দলীও নির্বাচনী ঐক্যের মধ্যে জামাতে ইসলামী বাংলাদেশ তাদের প্রাপ্ত ৬৮ আসনের মধ্যে ৬৬ আসনের বিপরীতে ১১ জন সংরক্ষিত নারী সদস্যের আসন পায়। এনসিপি তাদের প্রাপ্ত ছয় আসনের বিপরীতে একটি সংরক্ষিত নারী আসন পায়। উপরোক্ত ১২ আসনের পর জামাতে ইসলামীর দুটি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের দুটি ও খেলাফত মজলিসের একটি মোট পাঁচটি আসন অতিরিক্ত হয়। সংসদে প্রতি ছয়টি আসনের বিপরীতে একটি সংরক্ষিত নারী আসন রয়েছে। সেই হিসাবে ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের কাছে পাঁচটি আসন থাকায় আরো একটি আসন পাওয়ার হকদার হয় ১১দল।

জোটগত হিসাবে ১৩ তম সংরক্ষিত আসনটি যৌক্তিক কারণেই বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের হিস্যায় আসে। সেই হিসাবে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস সংরক্ষিত নারী আসনে একজন সদস্য দেয়ার সুযোগ লাভ করে।

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সাংগঠনিক সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে বেশ কয়েকজন সম্ভাব্য নারী দায়িত্বশীলের মধ্য থেকে সার্বিক বিবেচনায় ইঞ্জিনিয়ার মাহবুবা হাকিমকে এ দায়িত্বের জন্য নির্বাচন করা হয়। সেমতে তিনি নোমিনেশন পেপার সাবমিট করেছেন এবং আলহামদুলিল্লাহ আজ তার নোমিনেশন নির্বাচন কমিশন কর্তৃক বৈধ ঘোষিত হয়েছে। সুতরাং এখন সংসদ সদস্য হতে আর কোন বাধা থাকছে না।

আত্মীয়তার সম্পর্কে মাহবুবা হাকিম আমার ভাগ্নি হয়। আমার বড় চাচা শাইখুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক রাহিমাহুল্লাহর বড় ভাই হলেন মরহুম নুরুল হক। ১১ কন্যা ও তিন সন্তানের জনক তিনি। আমার চাচাতো বোন মাহবুবা হাকিমের আম্মা হলেন ভাই বোনদের মধ্যে নবম।

আত্মীয়তার সূত্রে ছোটকাল থেকেই দেখেছি আপাকে স্বপরিবারে আমাদের বাসায় যাতায়াত করতে। আমাদেরও যাতায়াত ছিল তাদের বাসায়। আমাদের দুলাভাই জনাব আব্দুল হাকিম সাহেব ছিলেন খুবই মিশুক ও রসিক মানুষ। ছিলেন ঐতিহ্যগত ব্যবসায়িক পরিবারের সন্তান।

এক সময় তাদের বাসা ছিল পুরানো ঢাকার বাদামতলী। সেখানে আমরা মাঝে মাঝে বেড়াতে যেতাম। ঈদ ও অন্যান্য ছুটি উপলক্ষে তাদের পুরো পরিবার আমাদের বাসায় বেড়াতে আসতো। এরপরে এক সময় হাকিম দুলাভাই বাড়ি করলেন সাভারে। খোলামেলা জায়গায় ঢাকার কোলাহল থেকে একটু দূরে বেশ সাজানো গোছানো বাড়ি ছিল তাদের। আমরা পুরো পরিবার সেখানে বেড়াতে গিয়েছি কয়েকবার।

ধীরে ধীরে জীবনের কর্মব্যস্ততায় জড়িয়ে পড়ি। আপনজনদের বাড়িতেও খুব একটা যাওয়ার সুযোগ হয় না। তাছাড়া দুলাভাই গত হয়েছেন বেশ কয়েক বছর। আল্লাহ তাকে জান্নাত নসিব করুন। আপা ও ভাগ্নে-ভাগ্নিদের সাথে আমাদের পরিবারের বন্ধন বেশ নিবীড়। মাহবুবা হাকিমের সম্পর্কটা অন্যদের চেয়ে আরো একটু বেশিই ঘনিষ্ঠ।

২০১৬ সালে মাহবুবার স্বামী সন্তানসহ আমি একসাথে হজব্রত পালন করি। পল্টনে কুরআন শিক্ষার খেদমতে নিয়োজিত আছে সে। বেশ দক্ষ একজন অ্যাডমিনিস্ট্রেটর হিসেবে মাদ্রাসা পরিচালনায় সুনাম কুড়িয়েছে।

ইতিপূর্বে ছাত্র জীবনেও রেখেছে সে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছে।

সাভার ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এসএসসি (১৯৯৯) ও এইচএসসি (২০০১) পরীক্ষায় স্টার মার্কসহ প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়। বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় (বুটেক্স) থেকে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে প্রথম শ্রেণিতে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করে।

পেশাগত জীবনে সে টেক্সটাইল খাতের স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান—টেক্সটাইল বার্ডস গ্রুপ, আনলিমা টেক্সটাইল লিমিটেড এবং ফার ইস্ট নিটিং অ্যান্ড ডাইং ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছে। ল্যাবরেটরি ম্যানেজমেন্ট ও কোয়ালিটি কন্ট্রোলে তার রয়েছে বিশেষ দক্ষতা।

এমনিতেই বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের বর্তমান অগ্রযাত্রায় এবং আগামীর রাজনৈতিক মিশন ও ভীষণ বাস্তবায়নে নারীদের মধ্যে সাংগঠনিক কার্যক্রম বিস্তারের চিন্তা করছে। এ ক্ষেত্রে যোগ্য দায়িত্বশীলের সন্ধানে আছি আমরা। এরই মধ্যে সংরক্ষিত নারী আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচনের তাগাদা সামনে আসায় সম্ভাব্য দায়িত্বশীলদের যাচাই-বাছাই শেষে আমাদের কাছে মাহবুবা হাকিমকে সবচেয়ে উপযুক্ত ও যোগ্য মনে হয়েছে। তবে আমাদের দ্বিধা ছিল যে, একবার পেশাজীবন ছেড়ে কুরআনের খেদমতে আত্মনিয়োগ করা আমার ভাগ্নি এই দায়িত্ব নিতে সম্মত হবে কিনা। কিংবা তার অভিভাবক তাকে অনুমতি দিবে কিনা। বিষয়গুলো নিয়ে সাংগঠনিক ফোরামে পরামর্শ করে তাদের সাথে আলোচনায় বসি। বেশি দ্বিধা ছিল স্বামীর পক্ষ থেকে অনুমতির বিষয়ে। পরে দেখলাম আমাদের জামাই বাবাজি ডাক্তার আওলাদ হোসেন প্রচন্ড রকম আমার ভক্ত। মামুন মামা নামে তার ভক্তি ও ভালোবাসার কোন শেষ নেই। তাছাড়া আপার পূর্ণ পরিবার শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক ও তার পরিবারের প্রতি অগাধ আস্থা ও ভালোবাসা লালন করেন। সুতরাং এই প্রস্তাবে তাদের স্বতঃস্ফূর্ত সম্মতি জ্ঞাপন করতে কোন দ্বিধা হয়নি। সংগঠন ও পরিবারের সকলের সম্মতিতেই মাহবুবা হাকিম এই মহান দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছে।

ইনশাআল্লাহ তাগলীবেদ্বীন তথা দ্বীন বিজয়ের চলমান সংগ্রাম ও বাংলাদেশে ইসলামী রাজনীতির কল্যাণে সে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হবে।

পেশাজীবন ও পড়ালেখার জগত ছেড়ে দীর্ঘ একটা সময় নিরবে নিভৃতে কাটিয়ে দেয়ার পর হঠাৎ জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে মাহবুবা হাকিমের নাম দেখে তার চেনা জানা জগতে একরকম তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই বিস্মিত হয়েছেন। যে মেয়ে উচ্চ বেতনের চাকরি ছেড়ে দিয়ে সন্তানদের শিক্ষা, পরিবারের সেবা ও কুরআনের খেদমতের জন্য আত্মনিয়োগ করেছে, জাতীয় পর্যায়ের এত বড় দায়িত্বে সে কি করে এলো!

মূলত সে আসেনি, তাকে সবাই মিলে এনেছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “যে ব্যক্তি দায়িত্ব চেয়ে নেয়, তাকে আল্লাহর পক্ষ থেকে সাহায্য করা হয় না। আর যে দায়িত্ব না চেয়ে পরামর্শের মাধ্যমে পায়, আল্লাহর পক্ষ থেকে তাকে সাহায্য করা হয়”। এই হাদিসের মর্ম অনুসারে মাহবুবা হাকিম এমপি বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের পক্ষ থেকে একটি সুন্দর দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে ইনশাআল্লাহ। বাংলাদেশের কল্যাণকামী ও ইসলামপন্থী সকলের আন্তরিক দোয়া তার সাথে থাকবে। খেলাফত প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম ও ইসলামী রাজনীতির জাগরণে সে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আমরা আশাবাদী।

লেখক: আমির, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস

Jubokantho24 Ad
এ জাতীয় আরো সংবাদ
এ জাতীয় আরো সংবাদ