
আজকের বিশ্বে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক আর স্লোগান বা আবেগপ্রবণ অবস্থানের ওপর গড়ে ওঠে না। বরং পারস্পরিক স্বার্থ, রাজনৈতিক বাস্তবতা ও অর্থনৈতিক বিবেচনাই এখন রাষ্ট্রগুলোর সম্পর্ক পরিচালনার মূল ভিত্তি হয়ে উঠেছে। এই বাস্তবতা থেকেই রাষ্ট্রগুলো বর্তমান পরিস্থিতি ও ভবিষ্যতের প্রয়োজন বিবেচনায় নিজেদের অংশীদারিত্ব গড়ে তুলছে।
গত কয়েক দশকে যুদ্ধ, সংঘাত ও আন্তর্জাতিক চাপের কারণে আফগানিস্তানের আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে বর্তমান সময়ে ইমারাতে ইসলামিয়ার নেতৃত্বে দেশটির কূটনৈতিক তৎপরতা ক্রমেই বাড়ছে। এর লক্ষ্য হলো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আফগানিস্তানের উপস্থিতি শক্তিশালী করা এবং রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতার গণ্ডি থেকে দেশকে বের করে আনা। এ জন্য বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সংলাপ ও সহযোগিতার সেতুবন্ধন সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।
কুয়েতের পক্ষ থেকে ইমারাতে ইসলামিয়াকে কূটনৈতিক দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্তকে আফগানিস্তানের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার স্বীকৃতি বাড়ার গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কুয়েত ভারসাম্যপূর্ণ নীতি ও অঞ্চলে বিস্তৃত সম্পর্কের জন্য পরিচিত। দেশটি সাধারণত রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রয়োজনীয়তা বাস্তবতার আলোকে মূল্যায়ন করেই এ ধরনের পদক্ষেপ নেয়।
গত কয়েক বছরে ইমারাতে ইসলামিয়া রাজনৈতিক চাপ, অর্থনৈতিক বিধিনিষেধ ও গণমাধ্যমকেন্দ্রিক প্রচারণার মুখোমুখি হয়েছে। তবুও তারা কয়েকটি দেশের সঙ্গে যোগাযোগের পথ খোলা রাখতে সক্ষম হয়েছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পৃক্ততার পরিসরও বিস্তৃত করেছে।
এর পেছনে আফগানিস্তানের ভূরাজনৈতিক গুরুত্বও একটি বড় কারণ। পাশাপাশি দেশটির অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও কৌশলগত অবস্থান তাকে আঞ্চলিক সমীকরণে একটি প্রভাবশালী উপাদানে পরিণত করেছে।
এ ধরনের কূটনৈতিক পদক্ষেপ বৃদ্ধি পারস্পরিক আস্থা ও উন্মুক্ততার মাত্রা বাড়ার ইঙ্গিত দেয়। একই সঙ্গে এটি নিশ্চিত করে যে দ্রুত পরিবর্তনশীল আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে আফগানিস্তানকে উপেক্ষা করা বা বিচ্ছিন্নতার দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে তার সঙ্গে আচরণ করা আর বাস্তবসম্মত কোনো বিকল্প নয়।
অনেক দেশ এখন আফগানিস্তানকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখতে শুরু করেছে। এই দৃষ্টিভঙ্গি যুদ্ধ ও সংকটের সঙ্গে যুক্ত পুরোনো ধারণা থেকে সরে এসে পারস্পরিক স্বার্থ ও সহযোগিতার সুযোগের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
এই পরিবর্তনের ফলে আঞ্চলিক অংশীদার হিসেবে আফগানিস্তানের গুরুত্ব বাড়ছে। দেশটি অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ প্রকল্পে ভূমিকা রাখতে এবং অঞ্চলের স্থিতিশীলতা জোরদারে সক্ষম অংশীদার হিসেবে সামনে আসছে।
তবে এসব অগ্রগতি ইমারাতে ইসলামিয়ার ওপর আরও বড় দায়িত্বও অর্পণ করছে। এসব দায়িত্ব পালনে পররাষ্ট্রনীতির উন্নয়ন অব্যাহত রাখা, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে আস্থা জোরদার করা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা সুসংহত করার প্রচেষ্টা বাড়ানো প্রয়োজন। এর ইতিবাচক প্রভাব আফগানিস্তানের মর্যাদা ও বৈদেশিক সম্পর্কের ওপর পড়বে।
কুয়েতের এই পদক্ষেপ অন্যান্য মুসলিম দেশের প্রতিও স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে। আর তা হলো, আফগানিস্তানের সঙ্গে ইতিবাচক যোগাযোগ ও সম্পৃক্ততা এখন রাজনৈতিক বাস্তবতা ও পারস্পরিক স্বার্থের দাবি করা এক প্রয়োজনীয়তায় পরিণত হয়েছে।
আস্থা গঠনের প্রচেষ্টা যদি একই গতিতে অব্যাহত থাকে, তাহলে আগামী দিনে আফগানিস্তানের কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সহযোগিতার ক্ষেত্র আরও বিস্তৃত হতে পারে।
দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্ব, নতুনভাবে গড়ে ওঠা আঞ্চলিক জোট এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে অর্থনৈতিক প্রয়োজনীয়তার ক্রমবর্ধমান প্রভাবের প্রেক্ষাপটে আফগানিস্তানের মর্যাদা শক্তিশালী করা ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষার জন্য সক্রিয় ও সচেতন কূটনীতিই সবচেয়ে উপযুক্ত পথ হিসেবে দেখা যাচ্ছে।
কারণ দেশটি যত বেশি বাস্তবতা ও প্রজ্ঞার সঙ্গে বৈদেশিক সম্পর্ক পরিচালনায় সফল হবে, তত বেশি স্থিতিশীলতা অর্জনের কাছাকাছি পৌঁছাবে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক পরিসরে একটি কার্যকর ও কেন্দ্রীয় রাষ্ট্র হিসেবে নিজের উপস্থিতিও সুসংহত করতে পারবে।
সূত্র: হুরিয়াত রেডিও
