জীবনকালীন ভোগাধিকার রেখে সম্পত্তি হস্তান্তরের নতুন বিধান শরিয়াহর আলোকে পুনর্বিবেচনা করা জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক। একই সঙ্গে ‘সংসদে দ্রুত পাস করায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তিনি।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) এক বিবৃতিতে মাওলানা মামুনুল হক বলেন, গতকাল রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) সংসদে আইনটি পাস হয়েছে। বৃদ্ধ মা-বাবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অবশ্যই প্রয়োজন। তবে সেই নিরাপত্তার নামে এমন কোনো বিধান করা যাবে না, যা আল্লাহ তাআলা নির্ধারিত হেবা, ওয়াসিয়ত ও ফারায়েজের শরয়ী বিধানকে পাশ কাটানোর সুযোগ তৈরি করে।
তিনি বলেন, জীবিত অবস্থায় হেবা এবং মৃত্যুর পর ফারায়েজ অনুযায়ী উত্তরাধিকার—দুটি পৃথক বিষয়। নতুন আইন যেন কোনো ওয়ারিশকে তার শরিয়াহ নির্ধারিত অধিকার থেকে বঞ্চিত করার হাতিয়ার না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
মাওলানা মামুনুল হক বলেন, ইসলামে হেবা শুধু কাগজে-কলমে সম্পত্তি লিখে দেওয়ার নাম নয়; এর নিজস্ব শরয়ী কাঠামো রয়েছে। হানাফি ফিকহে ইজাব, কবুল ও কবয হেবার মৌলিক বিষয়। গ্রহীতার বাস্তব দখল ও কর্তৃত্বও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, নতুন আইনে মালিকানা হস্তান্তরের কথা বলা হলেও দাতার জীবদ্দশা পর্যন্ত সম্পত্তির ভোগ ও ব্যবহার তাঁর কাছেই রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ফলে এখানে প্রকৃত হস্তান্তর ও কবয কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
হেবা ও সন্তানদের মধ্যে সম্পত্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে ন্যায়বিচারের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি নু‘মান ইবনে বশীর (রা.)-এর হাদিস উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, তাঁর পিতা তাঁকে বিশেষ একটি দান করলে রাসুলুল্লাহ সা. জিজ্ঞেস করেন, অন্য সন্তানদেরও অনুরূপ দেওয়া হয়েছে কি না। তিনি না বললে নবী সা. বলেন, ‘আল্লাহকে ভয় করো এবং তোমাদের সন্তানদের মধ্যে ন্যায়বিচার করো।’ পরে তাঁর পিতা সেই দান ফিরিয়ে নেন। —সহিহ বুখারি
হেবা ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারেও রাসুলুল্লাহ সা. কঠোর সতর্কতা দিয়েছেন উল্লেখ করে তিনি ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিস উদ্ধৃত করেন। এতে হেবা ফিরিয়ে নেওয়াকে নিজের বমি পুনরায় খাওয়ার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। —সহিহ বুখারি
মাওলানা মামুনুল হক বলেন, হেবা ইসলামী শরিয়াহর একটি স্বতন্ত্র বিধান। এর মালিকানা, কবয, দখল ও প্রত্যাহারের বিষয়ে শরিয়াহর সুস্পষ্ট নীতিমালা রয়েছে। তাই আইনটির মধ্যে ইসলামের হেবা ও ফারায়েজের বিধানকে অবজ্ঞা করার কোনো সুযোগ রাখা উচিত নয়।
তিনি আরও বলেন, সরকার বলছে নতুন বিধান সাধারণ হেবা বা মুসলিম আইনের হেবাকে প্রভাবিত করবে না। কিন্তু বাস্তবে এই আইন হেবার শরয়ী কাঠামোকে পাশ কাটিয়ে সম্পত্তির মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণের নতুন ব্যবস্থা তৈরি করছে কি না, তা গভীরভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
বিশেষ করে দাতা জীবিত থাকা অবস্থায় সম্পত্তির ভোগ ও নিয়ন্ত্রণ নিজের কাছে রেখে নির্দিষ্ট ব্যক্তির নামে সম্পত্তি হস্তান্তর করলে প্রকৃত কবয, পূর্ণ মালিকানা ও হস্তান্তরের চূড়ান্ততা নিয়ে শরয়ী প্রশ্ন তৈরি হতে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
মাওলানা মামুনুল হক বলেন, এ আইনের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো—হেবার নামে যেন আল্লাহ নির্ধারিত ফারায়েজকে পাশ কাটিয়ে কোনো নির্দিষ্ট ওয়ারিশকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার পথ তৈরি না হয়। কোনো ব্যক্তি জীবদ্দশায় তাঁর সম্পত্তি এমনভাবে নির্দিষ্ট একজন উত্তরাধিকারীর নামে হস্তান্তর করলে, যাতে মৃত্যুর পর অন্য ওয়ারিশরা কার্যত বঞ্চিত হন, তাহলে তা ইসলামের উত্তরাধিকার ব্যবস্থার ন্যায়বিচারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি বলেন, সংসদে শরিয়াহ বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়ার দাবি ওঠার পরও বিলটি দ্রুত পাস করা হয়েছে। হেবা, ওয়াসিয়ত ও ফারায়েজের মতো গুরুত্বপূর্ণ শরয়ী বিধানের সঙ্গে সম্পর্কিত আইন প্রণয়নের আগে দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেম, মুফতি, ফকীহ ও শরিয়াহ বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়া উচিত ছিল।
বিএনপির বিভিন্ন রাজনৈতিক অঙ্গীকারের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও নৈতিকতা সমুন্নত রাখা এবং মহান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাসের ভিত্তিতে ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ইসলামবিরোধী কোনো আইন না করার অঙ্গীকারও করা হয়েছে। তাহলে ইসলামের হেবা ও ফারায়েজের মতো সুস্পষ্ট শরিয়াহ বিধানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি আইন এত দ্রুত পাস করা হলো কেন—সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।
মাওলানা মামুনুল হক ‘Transfer of Property (Amendment) Act, 2026’-এর ১২২এ ও ১২২বি ধারা পুনর্বিবেচনার দাবি জানান। একই সঙ্গে আলেম-উলামা, মুফতি, ফকীহ ও শরিয়াহ বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় সংশোধন আনার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি বলেন, বৃদ্ধ মা-বাবার নিরাপত্তা অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে; কিন্তু এর নামে হেবার শরয়ী বিধান ও আল্লাহর নির্ধারিত ফারায়েজকে দুর্বল করা যাবে না। মানুষের তৈরি কোনো আইনকে আল্লাহর নির্ধারিত বিধানের বিকল্প হিসেবে দাঁড় করানোর যেকোনো প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসসহ ধর্মপ্রাণ মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
