মুসলিম কবরস্থানে উগ্রবাদী হামলা: কবরে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর

ভারতের রাজধানী দিল্লির উজিরবাদ এলাকায় অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক মুসলিম কবরস্থানে উগ্রবাদী একদল যুবক কর্তৃক বর্বরোচিত হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। পবিত্র রমজান মাসে সংঘটিত এই ন্যক্কারজনক ঘটনায় কবরের পবিত্রতা নষ্ট করা ছাড়াও অগ্নিসংযোগের মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওর ভিত্তিতে পুলিশ তদন্ত শুরু করলেও এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।

ঘটনার মূল অভিযুক্ত হিসেবে আলোচিত স্বঘোষিত হিন্দু অ্যাক্টিভিস্ট সত্যম পণ্ডিত (কারো মতে আকাশ পণ্ডিত) এবং তার অনুসারীদের পক্ষ থেকে এই কর্মকাণ্ডকে ‘অবৈধ দখল উচ্ছেদ’ বা ‘ধর্মীয় জাগরণ’ হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে অভিযুক্তদের দাবি করতে দেখা যায় যে, উক্ত স্থানটি বিতর্কিত এবং সেখানে নিয়মবহির্ভূতভাবে কার্যক্রম চলছে। অভিযুক্ত সত্যম পণ্ডিত ইতিপূর্বেও একই স্থান থেকে উস্কানিমূলক ভিডিও প্রকাশ করে দাবি করেছিলেন যে, স্থানীয় জননিরাপত্তা ও ধর্মীয় ভারসাম্য রক্ষায় তাদের এই পদক্ষেপ জরুরি। যদিও তাদের এই দাবির স্বপক্ষে কোনো আইনি বৈধতা বা প্রশাসনের অনুমতি ছিল না, তবুও তারা বিষয়টিকে একটি তথাকথিত ‘আন্দোলন’ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে।

গত ১ মার্চ, যখন মুসলিম উম্মাহ পবিত্র রমজান পালন করছে এবং দেশজুড়ে হোলি উৎসবের আবহ বিরাজ করছিল, তখন দিল্লির উজিরবাদ এলাকায় যমুনা নদীর তীরবর্তী মুসলিম কবরস্থানে এই হামলার ঘটনা ঘটে। ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, সত্যম পণ্ডিতের নেতৃত্বে একদল যুবক হাতুড়ি দিয়ে কবরের নামফলক ও স্মৃতিস্তম্ভ ভেঙে ফেলছে। তারা কবরের ওপর বিছানো চাদরগুলোতে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং মৃত ব্যক্তিদের উদ্দেশ্য করে চরম আপত্তিকর ও অবমাননাকর মন্তব্য করতে থাকে।

কবরস্থানের কেয়ারটেকার মাহফুজ খান জানান, “অসামাজিক কিছু মানুষ ভেতরে ঢুকে আমাদের প্রিয়জনদের কবরের ব্যাপক ক্ষতি করেছে। তারা কবরের ভেতরে থাকা দেহাবশেষেরও ক্ষতি করার চেষ্টা করেছে। আমরা তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশকে জানিয়েছি।” স্থানীয় মুসলিমরা জানান, হামলার খবর পেয়ে তারা দ্রুত কবরস্থানে ছুটে যান এবং ভাঙা কবরগুলো মেরামত ও নতুন চাদর দিয়ে ঢেকে দেওয়ার চেষ্টা করেন। নিরাপত্তার অভাবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাসিন্দা বলেন, “আমাদের হৃদয় ভেঙে গেছে। এটি আমাদের পূর্বপুরুষদের শেষ আশ্রয়স্থল। এমন আক্রমণ আমাদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত করে তুলছে।” উজিরবাদের এই কবরস্থানটি ওয়াকফ বোর্ডের আওতাধীন এবং এর সীমানা প্রাচীর নির্মাণের বিষয়ে উচ্চ আদালতের একটি নির্দেশনাও রয়েছে। আদালতের সুরক্ষা কবজ থাকা সত্ত্বেও এই অনুপ্রবেশ ও হামলা স্থানীয় মুসলিমদের মধ্যে চরম নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করেছে।

উজিরবাদের এই ঘটনা কেবল একটি ফৌজদারি অপরাধ নয়, বরং এটি ধর্মীয় স্বাধীনতা ও মানবিক মর্যাদার ওপর চরম আঘাত। যদি প্রথমবার উস্কানিমূলক ভিডিও প্রকাশের সময়ই পুলিশ কার্যকর পদক্ষেপ নিত, তবে কবরে অগ্নিসংযোগের মতো এই চরম ধৃষ্টতা এড়ানো সম্ভব হতো।

তিমারপুর থানা পুলিশ ঘটনার প্রেক্ষিতে একটি মামলা দায়ের করেছে এবং ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দোষীদের শনাক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। তবে সাধারণ নাগরিক ও মুসলিম নেতৃবৃন্দের দাবি, কেবল মামলা নয়, বরং সত্যম পণ্ডিতসহ মূল অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। আইনের শাসন বজায় রাখতে এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষ তদন্ত অপরিহার্য। মৃত মানুষের শেষ ঠিকানার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের নৈতিক ও আইনি দায়িত্ব। এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচারই কেবল ভবিষ্যতে এ ধরনের বিদ্বেষমূলক কর্মকাণ্ড প্রতিরোধ করতে পারে।

Jubokantho24 Ad
এ জাতীয় আরো সংবাদ
এ জাতীয় আরো সংবাদ