
কুরবানি ইসলামের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। এটি কেবলই পশু জবাই করার কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়। মূলত আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নিজের প্রিয় জিনিস উৎসর্গ করার মানসিকতা তৈরি করার নামই কুরবানি। তাই কুরবানির পশু কেনা থেকে শুরু করে তার যত্ন নেওয়া, জবাই করা এবং গোশত বণ্টন; প্রত্যেকটি ধাপে ইসলামের দিকনির্দেশনা, মানবিকতা ও শালীনতা বজায় রাখা আবশ্যক।
আমাদের সমাজে কুরবানির মৌসুমে পশু কেনা, সাজানো, ছবি তোলা, বাজারে ঘোরানো বা শক্তির মহড়া দেওয়ার মতো নানা প্রবণতা চোখে পড়ে। এগুলোর কিছু বিষয় স্বাভাবিক হলেও, অনেক সময় পশুর প্রতি অমানবিক আচরণ, অহংকার, লৌকিকতা কিংবা অসচেতনতা প্রকাশ পেয়ে যায়। অথচ ইসলাম পশুর প্রতিও পরম দয়া, কোমলতা ও ন্যায়সংগত আচরণ করার নির্দেশ দিয়েছে।
পশুর প্রতি দয়া ইসলামের শিক্ষা
ইসলাম মানুষের অধিকারই প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি পশু-পাখির অধিকারও অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছে। মহান আল্লাহ পৃথিবীর সমস্ত প্রাণীকে তার সৃষ্টি হিসেবে মর্যাদা দিয়েছেন। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, পৃথিবীর সব জীবজন্তু ও আকাশে উড়ন্ত পাখিরাও তোমাদের মতোই একেকটি সম্প্রদায়। অর্থাৎ প্রাণীরাও আল্লাহর সৃষ্টি, তাদেরও জীবন ও অনুভূতি আছে।
কুরবানির পশুর ক্ষেত্রেও এই মানবিক শিক্ষা সমানভাবে প্রযোজ্য। পশুটি যেহেতু আল্লাহর নামে উৎসর্গ করা হবে, তাই তার সঙ্গে কোনো ধরনের রূঢ়, নিষ্ঠুর বা অমানবিক আচরণ করা কোনোভাবেই মানায় না। পশুকে ভালো খাবার দেওয়া, বিশ্রামের সুযোগ করে দেওয়া, অতিরিক্ত কষ্ট না দেওয়া এবং জবাইয়ের মুহূর্তেও যেন সে কম কষ্ট পায় তা নিশ্চিত করা ইসলামের সৌন্দর্যের অংশ।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “আল্লাহ সব কিছুর ওপর ইহসান বা উত্তম আচরণ ফরজ করেছেন। তোমরা যখন জবাই করবে, সুন্দরভাবে জবাই করবে; ছুরি ধারালো করবে এবং জবাইয়ের পশুকে কষ্ট থেকে রেহাই দেবে।” (সহিহ মুসলিম)
কুরবানির পশুর সঙ্গে কী করা যাবে
কুরবানির পশুর যত্ন নেওয়া অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। পশু কিনে আনার পর তাকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন জায়গায় রাখা, পর্যাপ্ত খাবার ও পানি দেওয়া, গরমে ছায়ার ব্যবস্থা করা এবং বৃষ্টিতে নিরাপদ আশ্রয়ে রাখা; এসব কাজ যেমন মানবিক, তেমনি ধর্মীয় দৃষ্টিতেও প্রশংসনীয়।
পশুকে আদর করা, শান্ত রাখা, ভয় না দেখানো এবং তার শরীরে যেন কোনো আঘাত না লাগে সেদিকে খেয়াল রাখা উচিত। অনেক সময় পশু নতুন পরিবেশে এসে অস্থির হয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে অধৈর্য হয়ে তাকে মারধর না করে মায়া দিয়ে শান্ত করতে হবে। পশু নিয়ন্ত্রণের জন্য রশি ব্যবহার করা গেলেও দেখতে হবে তা যেন গলায় বা পায়ে কেটে বসে না যায়।
জবাই করার কিছু সময় আগে পশুকে পর্যাপ্ত পানি পান করানো উত্তম। তাকে দীর্ঘ সময় ক্ষুধার্ত রাখা, রোদে দাঁড় করিয়ে রাখা কিংবা ভিড়ের মধ্যে অযথা আটকে রাখা একদমই ঠিক নয়। কুরবানির পশু যদি অসুস্থ হয়ে পড়ে, তবে অবহেলা না করে পশু চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। কারণ কুরবানির জন্য নির্ধারিত পশু সুস্থ, সবল ও শরিয়তের শর্ত অনুযায়ী নিখুঁত হওয়া জরুরি।
পশুকে পরিষ্কার রাখা বা গোসল করানো যেতে পারে। তবে সাজানোর নামে তাকে অতিষ্ঠ করা, গায়ে ক্ষতিকর কেমিক্যাল রং মাখানো, চোখ-মুখে অস্বস্তিকর কিছু লাগানো বা এমনভাবে সাজানো যাতে পশুর কষ্ট হয়, তা থেকে অবশ্যই বিরত থাকতে হবে।
কী করা যাবে না
কুরবানির পশুকে মারধর করা, লাথি দেওয়া, লেজ মোচড়ানো, শিং ধরে টানাটানি করা, অতিরিক্ত দৌড়ানো বা ভয় দেখানো সম্পূর্ণ অনুচিত। পশুকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের অহংকার প্রকাশ করা যাবে না। আমাদের চারপাশে প্রায়ই দেখা যায় যে কার পশু কত বড়, কার পশুর দাম বেশি এসব নিয়ে যেন এক ধরণের প্রতিযোগিতা চলে। আমাদের মনে রাখা দরকার, কুরবানির মূল উদ্দেশ্য বাহাদুরি বা দাম দেখানো নয়। তাকওয়া অর্জন করাই এর মূল উদ্দেশ্য।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন: “আল্লাহর কাছে পৌঁছে না এগুলোর গোশত এবং রক্ত; বরং তার কাছে পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া।” (সূরা হজ, আয়াত ৩৭)
এই আয়াত আমাদের স্পষ্ট বার্তা দেয় যে, কুরবানির বাহ্যিক জাঁকজমকের চেয়ে আল্লাহর দরবারে নিয়ত, তাকওয়া ও আন্তরিকতাই বেশি মূল্যবান।
কখনোই এক পশুর সামনে অন্য পশুকে জবাই করা উচিত নয়, এমনকি পশুর সামনে ছুরি ধার করাও অনুচিত। এতে পশু প্রচণ্ড ভয় পেয়ে যায়। একইভাবে জবাইয়ের ঠিক আগমুহূর্তে পশুকে মাটিতে ফেলে দীর্ঘ সময় চেপে রাখা, তার ওপর ভারী হয়ে বসে থাকা বা অযথা টানাটানি করা নিষ্ঠুরতার শামিল।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছবি বা ভিডিও করার জন্য পশুকে অস্বাভাবিক ভঙ্গিতে দাঁড় করিয়ে রাখা, উত্তেজিত করা বা বারবার বিরক্ত করা কোনো ভালো কাজ নয়। কুরবানি একটি পবিত্র ইবাদত; এটিকে লোকদেখানো সামাজিক উৎসবে পরিণত করা ঠিক হবে না। ছবি তোলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ না হলেও, তা যেন অহংকার বা পশুর কষ্টের কারণ না হয়ে দাঁড়ায় সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
জবাইয়ের সময় করণীয়
কুরবানির জবাই হতে হবে সম্পূর্ণ আল্লাহর নামে। যিনি জবাই করবেন তাকে অবশ্যই দক্ষ হতে হবে, যাতে পশুকে অপ্রয়োজনীয় কষ্ট পেতে না হয়। জবাইয়ের ছুরিটি যেন অত্যন্ত ধারালো থাকে তা নিশ্চিত করা আবশ্যক। ভোঁতা ছুরি দিয়ে জবাই করা চরম নিষ্ঠুরতা এবং ইসলামের শিক্ষার পরিপন্থী।
জবাইয়ের সময় “বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার” বলা সুন্নত। পশুকে কেবলামুখী করে শোয়ানো উত্তম। জবাইয়ের কাজটি দ্রুত ও সঠিক নিয়মে সম্পন্ন করতে হবে। জবাই করার পর পশুটি পুরোপুরি নিস্তেজ বা শান্ত হওয়ার আগে চামড়া ছাড়ানো বা কোনো অঙ্গ কাটা যাবে না। এতে পশুর যন্ত্রণার মাত্রা বহুগুণ বেড়ে যায়।
যারা নিজেরা জবাই করতে পারেন না, তারা অভিজ্ঞ কসাই বা দক্ষ ব্যক্তির সাহায্য নেবেন। তবে কসাইয়ের ওপর পুরো দায়িত্ব ছেড়ে দিলেই মালিকের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। পশুর সঙ্গে মানবিক আচরণ, চারপাশের পরিচ্ছন্নতা এবং গোশত সঠিকভাবে সংরক্ষণ ও বণ্টনের ব্যাপারে মালিকের সরাসরি নজরদারিতে রাখা উত্তম।
শিশুদের সামনে বিষয়টি যেভাবে উপস্থাপন করবেন
ঈদের দিনগুলোতে শিশুরা কুরবানির পশুর সঙ্গে খুব দ্রুত মিশে যায়, তাকে নিজ হাতে খাওয়ায় ও আদর করে। তাই জবাইয়ের সময় শিশুদের মানসিক অবস্থার বিষয়টি মাথায় রাখা দরকার। কোমলমতি শিশুদের সামনে আচমকা জবাইয়ের দৃশ্য ফুটিয়ে তুললে তাদের মনে ভয় বা ট্রমা তৈরি হতে পারে। তাই তাদের বয়স ও বোঝার ক্ষমতা বিবেচনা করে কুরবানির পেছনের শিক্ষাটি বুঝিয়ে বলা উচিত।
শিশুদের শেখানো যেতে পারে যে কুরবানি কোনো নিষ্ঠুরতা নয়। এটি আল্লাহর নির্দেশ পালন, ত্যাগের মহিমা এবং গরিব-দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর এক সুন্দর মাধ্যম। এতে তারা কুরবানিকে কেবল পশু জবাই হিসেবে না দেখে একটি উচ্চ নৈতিক ও আধ্যাত্মিক শিক্ষা হিসেবে হৃদয়ে ধারণ করতে পারবে।
পরিচ্ছন্নতা ও জনস্বাস্থ্য
কুরবানির পশুর প্রতি দয়া দেখানোর পাশাপাশি চারপাশের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখাও ঈমানের অঙ্গ। রাস্তাঘাট, ড্রেন, খোলা মাঠ বা জনসমাগমের জায়গায় যত্রতত্র বর্জ্য ফেলে রাখা যাবে না। এর থেকে ছড়ানো দুর্গন্ধ ও রোগজীবাণু জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।
জবাই শেষ হওয়ার পরপরই রক্ত, বর্জ্য ও অপ্রয়োজনীয় অংশগুলো দ্রুত নির্দিষ্ট স্থানে গর্ত করে মাটিচাপা দিতে হবে কিংবা অপসারণ করতে হবে। স্থানীয় প্রশাসন বা সিটি কর্পোরেশনের পরিচ্ছন্নতার নির্দেশনাগুলো অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলা উচিত। কুরবানি যেহেতু একটি পবিত্র ইবাদত। তাই আমাদের চারপাশটাও যেন পরিচ্ছন্ন ও সুশৃঙ্খল থাকে।
কুরবানির আসল সৌন্দর্য তাকওয়ায়
কুরবানির পশু আকারে বড় নাকি ছোট, তার দাম লাখ টাকা নাকি তার চেয়ে কম, এসব আল্লাহর কাছে বিবেচ্য নয়। আল্লাহর দরবারে পৌঁছায় মানুষের নিয়ত কতটা খাঁটি, আমল কতটা শরিয়তসম্মত এবং তার আচরণ কতটা মানবিক। পশুর প্রতি নিষ্ঠুরতা দেখিয়ে, প্রতিবেশীর কষ্ট বাড়িয়ে, পরিবেশ নোংরা করে কিংবা মনের ভেতর অহংকার পুষে রেখে কুরবানির প্রকৃত উদ্দেশ্য সফল করা সম্ভব নয়।
কুরবানি আমাদের শেখায় কীভাবে আল্লাহর আদেশের সামনে নিজের অহংকার, লোভ ও স্বার্থপরতাকে বিসর্জন দিতে হয়। সেই ত্যাগের মানসিকতা যেন পশুর সঙ্গে আমাদের আচরণেও ফুটে ওঠে। কারণ যে ইবাদতের সূচনা আল্লাহর নামে, তা দয়া, আত্মসংযম, পরিচ্ছন্নতা ও তাকওয়ার মাধ্যমেই পূর্ণতা পায়।
