
রসিদ ছাড়াই যাত্রীদের কাছ থেকে টাকা আদায়ের প্রতিবাদ করায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রকে মারধরের অভিযোগ উঠেছে টিটিদের বিরুদ্ধে। এর প্রতিবাদে মঙ্গলবার (২১ জুলাই) ক্যাম্পাসের চারুকলা সংলগ্ন এলাকায় রেললাইন অবরোধ করেছেন শিক্ষার্থীরা। ফলে রাজশাহীর সাথে সারা দেশের রেলযোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। সোমবার দিবাগত রাত ৩টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। আন্দোলনকারীরা ঘটনায় জড়িতদের শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর নাম ফোরকান উদ্দীন। তিনি আইন বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী থেকে জানা যায়, ঢাকা থেকে পদ্মা এক্সপ্রেস ট্রেনে রাজশাহী ফিরছিলেন তিনি। এ সময় যাত্রীদের কাছ থেকে রসিদ ছাড়াই টিটিরা টাকা আদায় করায় এর প্রতিবাদ করেন তিনি। এ জন্য তাকে পেছন থেকে গলা ধরে দুই বগির মাঝখানে নিয়ে যায় ৬-৭ জন টিটি। এরপর তার ঘাড়ে ও পিঠে উপর্যুপরি মারতে থাকে তারা। এক পর্যায়ে ট্রেনের জানালার ধারে নিয়ে গিয়ে ধাক্কা মেরে ফেলে দিতে চেষ্টা করে তারা।
এ ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়েছেন শিক্ষার্থী। এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচারের জন্য তরা চার দফা দাবি জানিয়েছেন। সেগুলো হলো অভিযুক্ত অপরাধীকে সশরীরে উপস্থিত করতে হবে, যেহেতু তিনি ঘুস গ্রহণ করেছেন, তাই সেই অপরাধে তার প্রাতিষ্ঠানিক শাস্তি স্থায়ী বহিষ্কার এবং রেলে ভ্রমণকারী নাগরিকের ওপর হত্যাচেষ্টার কারণে রেল কর্তৃপক্ষ বাদী হয়ে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেবে, ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীকে ক্ষতিপূরণ প্রদান করতে হবে, সকল দূরপাল্লার ট্রেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় স্টেশনে একটা যাত্রাবিরতি দিতে হবে।
ভুক্তভোগী ফোরকান উদ্দীন বলেন, সোমবার রাতে ঢাকা থেকে পদ্মা এক্সপ্রেস ট্রেনে রাজশাহী ফিরছিলাম। ট্রেনে খেয়াল করি যাত্রীদের কাছ থেকে রসিদ ছাড়াই টিটিরা টাকা আদায় করছে। টাকা নিচ্ছে, কিন্তু রসিদ দিচ্ছে না। আমি তখন প্রতিবাদ করে টিটিদের বলি রেলের টাকা রাষ্ট্রের সম্পদ। কিন্তু টিকেট ইস্যু না করে টাকা নিচ্ছেন কেন কেন? সচেতন নাগরিক হিসেবে আমি এর প্রতিবাদ করছি।
তিনি আরও বলেন, হঠাৎ করে পেছন থেকে গলা ধরে দুই বগির মাঝখানে নিয়ে যায় ৬-৭ জন টিটি। এরপর আমার ঘাড়ে ও পিঠে মারতে থাকে। এক পর্যায়ে ট্রেনের জানালার ধারে নিয়ে গিয়ে সজোরে ধাক্কা মারে। আমি পড়ে গেলে হয়তো খারাপ কিছু হতো। আমার চশমাও ভেঙে গেছে। আমি অভিযুক্তদের শাস্তি চাই।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থী ও শহীদ জিয়াউর রহমান হল সংসদের জিএস আরিফুল ইসলাম বলেন, অন্যায়ের প্রতিবাদ করায় আমাদের এক ভাইকে মারধর করা হয়েছে। রেলে অন্যায় এবং প্রতিবাদকারীদের হেনস্তা নিয়মিত ঘটনা হয়েছে দাঁড়িয়েছে। আমরা রেল অবরোধ করেছি। কর্তৃপক্ষ আসবে এবং ঘুস নেওয়ার দায়ে শাস্তি, মারধরের ক্ষতিপূরণসহ যথাযথ সমাধান না হওয়া পর্যন্ত রেল যোগাযোগ সম্পূর্ন বন্ধ থাকবে।
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হেনস্তার ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়েছে রাকসু। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়ে অবরোধ স্থলে অবস্থান করছেন রাকসু জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার। অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে এক পোস্টের মাধ্যমে এ আন্দোলনকে সমর্থন এবং দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত অবরোধ চলবে বলে জানিয়েছেন রাকসুর ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ।
ফেসবুক পোস্টে রাকসুর ভিপি মোস্তাকুর রহমান লিখেছেন, রেললাইন বন্ধ থাকবে। রেলওয়ে সংশ্লিষ্ট লোকরা আমাদের কাছে এসে এখন এটা সামলান। কাদের গায়ে হাত দিয়েছেন ঠাহর তো করতে হবে। পদ্মা এক্সপ্রেসের টিটির মাধ্যমে রাবির এক শিক্ষার্থী ভাইকে অন্যায়ভাবে মারধরের ঘটনার প্রতিবাদে রেললাইন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। স্টেশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আমাদের কাছে এসে এ ব্যাপারে সমাধান করবে। নচেৎ রাজশাহীর সাথে সারাদেশের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকবে। অভিযুক্তকে ক্ষমা চাইতে হবে। অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা দেখতে চাই।
তিনি আরও লিখেছেন, এর আগেও জানা অজানা এমন অনেক আচরণ রাবি শিক্ষার্থীদের সাথে করা হয়েছে। আজকে থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষার্থীর দিকে কখনো রেলগুন্ডারা বাঁকা চোখেও যেন না দেখে সে ব্যবস্থা করতে হবে। রাকসু ও হল সংসদ নেতৃবৃন্দ এই রেললাইন সার্বক্ষণিক পাহারায় থাকবেন।
বাংলাদেশ রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপককে একাধিকবার ফোন করলেও তিনি সাড়া দেননি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মাহবুবর রহমান বলেন, সোমবার রাতে আমাদের এক শিক্ষার্থীকে ট্রেনের টিকিট চেকারেরা (টিটি) প্রচণ্ডভাবে মারধর করেছে। এরই প্রতিবাদে আমাদের শিক্ষার্থীরা রেললাইন অবরোধ করেছে। যাত্রীদের অসুবিধা হচ্ছে আমরা বুঝতে পারছি। কিন্তু শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবিগুলোও আমাদের বিবেচ্য বিষয়। আমরা উভয় পক্ষের সাথে কথা বলে সমাধান করার চেষ্টা করছি।
এদিকে শিক্ষার্থীর ওপর পদ্মা এক্সপ্রেস ট্রেনে কর্তব্যরত ট্রাভেলিং টিকিট এক্সামিনারের (টিটিই) হামলা ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগ তুলে এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু)। একই সঙ্গে ঘটনার বিচার ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চার দফা দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। রাকসুর পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এসব দাবি জানানো হয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের এক শিক্ষার্থী পদ্মা এক্সপ্রেস ট্রেনে ভ্রমণের সময় কর্তব্যরত এক টিটিই সরকারি রসিদ ছাড়া ঘুষের বিনিময়ে বিনা টিকিটের যাত্রী পরিবহনের সুযোগ দিচ্ছিলেন। ওই শিক্ষার্থী এর প্রতিবাদ করলে টিটিই ও তার সহযোগীরা তাকে একটি কক্ষে নিয়ে দরজা বন্ধ করে মারধর করেন বলে অভিযোগ করা হয়।
এতে আরও বলা হয়, হামলার একপর্যায়ে অভিযুক্ত টিটিই শিক্ষার্থীকে চলন্ত ট্রেনের দরজার দিকে ধাক্কা দেন। তবে দরজা বন্ধ থাকায় তিনি প্রাণে বেঁচে যান। রাকসুর দাবি, এটি পরিকল্পিত হত্যাচেষ্টার শামিল এবং এমন ঘটনা সাধারণ যাত্রীদের নিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি।
ঘটনার পর রাকসু চার দফা দাবি উত্থাপন করেছে। দাবিগুলো হলো— অভিযুক্ত টিটিইকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের সামনে উপস্থিত করে জবাবদিহির আওতায় আনা, ঘুষ ও দুর্নীতির অভিযোগে তাকে স্থায়ীভাবে চাকরিচ্যুত করে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ, ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় রেলওয়ে স্টেশনে সকল দূরপাল্লার ট্রেনের বাধ্যতামূলক যাত্রাবিরতি নিশ্চিত করা।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, অবিলম্বে এসব দাবি বাস্তবায়ন করে অভিযুক্ত রেলকর্মীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় সাধারণ শিক্ষার্থীরা কঠোর কর্মসূচি দিতে বাধ্য হবে, যার দায়ভার সংশ্লিষ্ট রেলওয়ে কর্তৃপক্ষকে বহন করতে হবে।
